ডেনমার্ক ১ম, ১২৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১২৪তম
বার বার দুর্নীতিতে শীর্ষে থাকা বাংলাদেশ এবার তথ্য প্রযুক্তি র্যাংকিং-এ
পেছনেই থেকে যাচ্ছে। ক্ষুধা, দারিদ্র আর যুদ্ধপীড়িত বিভিন্ন দেশ তথ্য
প্রযুক্তিতে এগিয়ে গিয়েছে আর বাংলাদেশ ১২৭টি দেশের মধ্যে রয়েছে ১২৪তম
স্থানে। ২০০৬-২০০৭ সালের র্যাংকিং-এ বাংলাদেশ ১২২টি দেশের মধ্যে ১১৮তম
স্থানে থাকে আর ২০০৫ সালে ১১৫টি দেশের মধ্যে ১১০তম স্থানে থাকে। প্রায় ২৬
বছরের তথ্য প্রযুক্তির যাত্রায় বাংলাদেশ সবার শেষে পৌঁছে গেলেও আমাদের
পার্শ্ববর্তী দেশ নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলংকা এগিয়ে গেছে।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে চালিকা শক্তির
ভূমিকা পালন করছে। তথ্য প্রযুক্তি শুধুই যে যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নয়ন
ঘটিয়েছে বা প্রোডাক্টিভিটি বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণে তা নয়, পাশাপাশি এটি
সারা বিশ্বব্যাপী মানুষের জীবন মান উন্নয়নে এবং ব্যবসা বাণিজ্যে ব্যাপক
ভূমিকা পালন করে চলেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য আর শিল্প ক্ষেত্রে ইন্টারনেট এনে
দিয়েছে যুগান্তকারী পরিবর্তন। তথ্য এবং জ্ঞান নির্ভর সমাজ গঠনে পালন করছে
একমাত্র টুল হিসেবে। আর ওয়েব ২.০ প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্বকে আরো ছোট করে
দিয়েছে, ভার্চুয়াল কমিউনিটি এবং সোশ্যাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সমাজবদ্ধ
করেছে এবং বিশ্বব্যাপী মানুষের মধ্যে তথ্য যোগাযোগ বাড়িয়ে দিয়েছে।
প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানুষ এমনকি কৃষকদের কাছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম
জানা আর গ্রামাঞ্চলে গ্রামীণফোন যে ছোট ছোট উদ্যোক্তা তৈরি করেছে তাই এই
যুগের টেলিকমিউনিকেশন বিপ্লব। মোবাইল টেলিফোন যোগাযোগের ধরণ পরিবর্তন করে
দিয়েছে। ব্যস্ত মানুষদের জন্য মোবাইল ফোনই এনে দিয়েছে ইন্টারনেট ই-মেইল এর
মতো অতি প্রয়োজনীয় বিজনেস কমিউনিকেশন টুল।
দারিদ্র দূরীকরণ, মানুষের জীবন মান উন্নয়নে তথ্য প্রযুক্তি যে ভূমিকা পালন
করে চলেছে তা বিশ্বের সরকার, নীতিনির্ধারক, সিভিল সোসাইটি সবার কাছেই খুব
ভালভাবে বোধগম্য। আর তাই সব দেশের গুরুত্বপূর্ণ পলিসিখাতে তথ্যপ্রযুক্তিকে
বিশেষ বিবেচনায় আনা হচ্ছে। তৈরি হচ্ছে নানা দিক-নির্দেশনা। সিঙ্গাপুর,
ইস্তোনিয়া আর ইসরাইল এর মতো দেশের দিকে তাকালেই বোঝা যায় যে দেশগুলো কতো
দ্রুত তাদের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে আর উন্নত বিশ্বের কাতারে
দাঁড়িয়েছে। এ বিশ্ব খুব দ্রুতই নেটওয়ার্কড হয়ে যাচ্ছে। জনসাধারণ, ব্যবসা,
সরকারই শুধু যে একে অন্যের সাথে সংযুক্ত হয়ে পড়ছে তা নয় বরং পাবলিক তথ্য
অবকাঠামো দ্রুতগতিতে মানুষকে সংযুক্ত করছে। উচ্চ গতির ব্যান্ডউইডথ
কানেক্টিভিটি এখন প্রয়োজন হয়ে পড়েছে মানুষের। ইউনিভার্সেল ব্রডব্যান্ড
এক্সেস এখন মানুষের অধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমেরিকার শিকাগোর ‘ডিজিটাল
এক্সেস এলায়েন্স’ এ জন্য কাজও করছে। সাধারণ অর্থনৈতিক উন্নয়নের অংশ হিসেবে
ইউরোপীয়ান কমিশন উচ্চ গতির ব্যান্ডউইডথ কানেক্টিভিটি প্রদান করছে। উদাহরণ
হিসেবে যুক্তরাজ্যের পোস্ট অফিস নতুন একটি পরিসেবা চালু করেছে। তা হলো
উচ্চগতির ব্রডব্যান্ড সেবা। আগামী প্রজন্মের প্রযুক্তি হিসেবে ওয়াই ফাই
এবং ওয়াই ম্যাক্স খুব দ্রুত গতিতে বিস্তার লাভ করছে যোগাযোগকে আরো সহজলভ্য
ও গতিশীল করার জন্য। ওয়্যালসে ল্যান এর একটি এপ্লিকেশন হিসেবে ওয়াই ফাই
বাসা-বাড়ি, অফিস-আদালত, শর্ট রেঞ্জ ওয়্যারলেস ইন্টারনেট, সাইবার ক্যাফে,
ফাস্টফুড শপ সহ বিভিন্ন স্থানে স্বল্প পরিসরে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। উত্তর
আমেরিকার সরকারি হিসেবে একটি শহরের মানুষের ৪৫ শতাংশ প্রতিদিনই সিটি
কর্পোরেশন, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, মোবাইল ফোন, পাবলিক অফিস, পার্ক
প্রভৃতি অফিসে পরিসেবা নিয়ে যেতে হয় তাই সেখানে তথ্য পাওয়া নিশ্চিত করতে
পারলে জনগণের ছোটাছুটি কমে যায়। আমেরিকা ও কানাডা’র বিভিন্ন শহরে
ওয়্যাররেস কানেকশন সুবিধা রয়েছে জনগণের জন্য।
কপার তার এর কাটাকাটি থেকে বাঁচার জন্য বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশ ওয়াই
ম্যাক্স ব্যবহার করছে। ২০০৭ সালের প্রথম দিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ওয়ারিদ
টেলিকম এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান ওয়াতিন টেলিকম ও মটোরোলা পাকিস্তানের ১৭টি
শহরে ওয়াইম্যাক্স নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা করে। ভারতের গ্রামাঞ্চলে
ওয়াইম্যাক্স নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। তারা বলছে এটি থ্রিজি মোবাইল
প্রযুক্তির চেয়ে ৩০ গুণ দ্রুতগতির এবং ওয়ারলেস ডাটা রেট ১০০ গুণ দ্রুতগতির
নেটওয়ার্ক। ভারত দূর্গম সীমান্ত অঞ্চলের ইন্টারনেট সুবিধার জন্যই এই
ওয়াইম্যাক্স প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। যেখানে স্থানীয় ভাষায় কম্পিউটার
প্রদান করা হয়েছে এবং স্থানীয় কন্টেন্ট তৈরি করা হয়েছে। দ্রুত গতির
ইন্টারনেট সেবা, দারিদ্র বিমোচন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সর্বোত্তম
ব্যবহার নিশ্চিতে জাতীয় কর্মসূচী, অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ, ইউনিফাইড
কমিউনিকেশন, উদ্ভাবনী, তথ্য যুগের জন্য ই-স্কিল, বিজনেস নেটওয়ার্ক
ট্রান্সফার্মেশন প্রভৃতি বিষয়ের উপর সম্প্রতি ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরাম
‘দ্যা গ্লোবাল ইনফরমেশন টেকনোলজি রিপোর্ট ২০০৭-০৮’ প্রকাশ করেছে। এতে
বিভিন্ন দেশের তথ্য অবকাঠামো, ব্যবহার নিয়ে ১২৭ টি প্রোফাইল উপস্থাপন ও
গবেষণা করে তথ্যপ্রযুক্তি অর্থনীতির একটি র্যাংকিং তৈরি করা হয়। গত ৭ বছর
ধরে ৭ম বারের মতো ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরাম এ রিপোর্ট প্রকাশ করছে।
এ বছর সবচেয়ে নেটওয়ার্ক ইকোনোমির তালিকায় শীর্ষস্থানে উঠে আসে ডেনমার্ক।
২০০৩ সাল থেকে ডেনমার্ক র্যাংকিং-এ উপরে উঠে আসছে। অন্য চারটি নরডিক দেশও
তথ্য প্রযুক্তিতে তাদের সেরা অবস্থানে ধরে রেখেছে সুইডেন ২য় স্থান,
ফিনল্যান্ড ৬ষ্ঠ স্থান, আইসল্যান্ড ৮ম স্থান এবং নরওয়ে ১০ম স্থান। তৃতীয়
অবস্থানে রয়েছে সুইজারল্যান্ড। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ৩টি স্থান টপকে এবার
৪র্থ স্থান নিয়েছে। গত বছরের ১০তম স্থানে থাকা দক্ষিণ কোরিয়া এবার ৯ম
স্থানে।
১২৭টি দেশের তালিকায় এশিয়ান দেশগুলো বেশ এগিয়ে গেছে। ২০ তম স্থানে রয়েছে
সিঙ্গাপুর (৫ম), হংকং (১১তম), অস্ট্রেলিয়া (১৪তম), তাইওয়ান (১৭তম) এবং
জাপান (১৯তম)। এশিয়ার বড় অর্থনীতির মধ্যে ভারত ৪ র্যাংকিং পিছিয়েছে
অন্যদিকে চীন ৫টি র্যাংক এগিয়েছে। এ বছরের ‘দ্যা গ্লোবাল ইনফরমেশন
টেকনোলজি রিপোর্ট’ উপস্থাপন করে ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরাম এর অর্থনীতিবিদ
এবং কো-এডিটর আইরিন মিয়া। আর সার্ভের স্পন্সর ছিল বিশ্বের বৃহত্তম
ইন্টারনেট সুইচ ও রাউটার নির্মাতা সিসকো।
ইনোভেশন ও নেটওয়ার্কড হিসেবে এ বছর ৩টি কেস স্টাডি নিয়ে আলোচনা হয়। এগুলো হচ্ছে সিংগাপুর, কাতার ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন।
বাংলাদেশ ১২৭টি দেশের মধ্যে ১২৪তম
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বপ্রথম বাংলাদেশে কম্পিউটার আসলেও আমরাই
এই অঞ্চলের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া জাতি। ’৯০ এর দশকে দেশে ফ্যাক্স মেশিন
আমদানি করার চেষ্টা করলে বিদেশে ফ্যাক্সের মাধ্যমে দেশের তথ্য পাচার হয়ে
যাওয়ার দোহাই দিয়ে তা বন্ধ করে দেয়া হলো। ১৯৯৬ সালে ইন্টারনেট সার্ভিস
প্রোভাইডাররা অফলাইন ইন্টারনেট দেয়ার সময়ও একই দোহাই দিয়ে তা বিলম্বিত হল।
সমুদ্রের নীচ দিয়ে প্রবাহিত সাবমেরিন ক্যাবল এর সংযুক্তির প্রস্তাব এনে
পার্শ্ববর্তী দেশগুলো তার সংযোগ নিলেও বাংলাদেশ তা নেয়নি। একে একে ৩টি
সাবমেরিন ক্যাবল দিয়ে দক্ষিণ এশিয়া ছেয়ে গেলেও বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবলের
সংযোগ নেয়নি। পরবর্তীতে ৪র্থ সাবমেরিন ক্যাবলে কয়েক দফায় টেন্ডার বাতিল
করে অবশেষে ২০০৬ সালে সাবমেরিন ক্যাবলের সাথে সংযুক্ত হয়। চলতে থাকে
ভিওআইপি (ভয়েস ওভার আইপি) ব্যবসা। ভিওআইপি’র মাধ্যমে মানুষ অপেক্ষাকৃত
কমমূল্যে বিদেশে থাকা আপনজনদের সাথে কথা বলতে পারে বলে এটি ব্যাপক
জনপ্রিয়তা পায়। কিন্তু যারা এই ব্যাবসা করছে তাদের কোন সরকার নীতিমালা বা
লাইসেন্সিং এর আওতায় আনা হয়নি। কয়েক দফায় নীতিমালা তৈরি করে অর্ধশতাধিক
ভিওআইপি লাইসেন্স প্রদানের পূর্ব মুহূর্তে এটি আবার বন্ধ করে দেয়া হয়। আজো
চালু হয়নি মানুষের সস্তায় কথা বলার মাধ্যম ভিওআইপি। সফটওয়্যার রপ্তানি হাত
ছাড়া হয়ে যাওয়ার পর যা নিয়ে দিন মাতামাতি তা হলো বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং
বা বিপিএ। এরই একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসা হচ্ছে কলসেন্টার। যা ২০০৩ সাল
থেকে অনেক উদ্যোক্তা চেষ্টা করছিল। কিন্তু পথের কাটা হয়ে দাঁড়ায় ভিওআইপি।
ভিওআইপিকে বৈধ না করলে কলসেন্টার স্থাপনও অবৈধ। এখন সরকার কল সেন্টার
লাইসেন্সিং এর জন্য সহজ শর্তে লাইসেন্স আহবান করছে। বিগত সরকার একটি
ব্রডব্যান্ড পলিসিও তৈরি করেছে কিন্তু সেটি আর আলোর মুখ দেখেনি।
আজকের ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরামের প্রকাশিত ‘দ্য গ্লোবাল ইনফরমেশন টেকনোলজি
রিপোর্ট ২০০৭-০৮’-এ বিশ্বের ১২৭টি দেশের মধ্যে ১২৪তম স্থানে রয়েছে
বাংলাদেশ। ক্ষুধা, দারিদ্র, যুদ্ধপীড়িত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে র্যাংকিং এ
আমাদের চেয়ে এগিয়ে গেছে। তথ্যপ্রযুক্তিকে বর্তমান বিশ্বে অর্থনীতির
মাপকাঠি বলা হলেও এই দেশেরই একজন সাবেক অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, কম্পিউটার
কি ভাত দেয়? সরকারি নীতি নির্ধারণে জটিলতা, আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রীতা
আর কমিশন বাণিজ্যই মূলত আমাদের দেশের তথ্য প্রযুক্তি তথা অর্থনীতিকে
পিছিয়ে দিয়েছে। পিছিয়ে দিয়েছে দেশকে। দেশের তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের এখনকার
নাজুক অবস্থা, সফটওয়্যার রপ্তানির বেহাল দশা সর্বোপরি তথ্য প্রযুক্তি
শিক্ষা পিছিয়ে থাকা আর অনাগ্রহ বলে দেয় বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার কারণ।
সারা বিশ্বব্যাপী যখন নতুন প্রজন্মের ওয়াইম্যাক্স নিয়ে এগিয়ে চলছে তখন
বাংলাদেশে একই সাথে ওয়াই ফাই এবং ওয়াইম্যাক্স নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অথচ যে
ফ্রিকোয়েন্সি নিয়ে আমরা চিন্তিত ওয়াইফাই নেটওয়ার্ক এর কোন ফ্রিকোয়েন্সি
ব্যবহার করতে হয় না।
‘জ্ঞানী দেশ’ নামে খ্যাতি সিংগাপুর প্রাকৃতিক সম্পদবিহিন এবং দক্ষ
জনসম্পদের দেশ। সিংগাপুরও বাংলাদেশের মতো গত ২৬ বছর পূর্বে তথ্য
প্রযুক্তিতে যাত্রা করেছিল একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে। মধ্য প্রাচের
দেশ কাতার প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর একটি দেশ। সম্পদের প্রাচুর্যতা ধরে
রাখার জন্য কাতার তথ্য প্রযুক্তির দ্বারা গড়ে তুলেছে ‘জ্ঞান নির্ভর
কাতার’। এদেশে সব সরকারই তথ্য প্রযুুক্তিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়ার
কথা বলেছে। ফলশ্রুতিতে আমরা পেয়েছি ১২৪ তম স্থান।