সারা বিশ্বে চে গেভারা বিপ্লবের এক মূর্ত প্রতীক। বোধ করি আর কোন
ব্যাক্তির অবয়বে বিপ্লব এইভাবে ব্যাপ্ত হয়ে উঠেনি, এমন কি ক্যাস্ত্রোর
মাঝেও নয়।
বিপ্লবীরা স্বপ্ন দেখেন। স্বপ্ন না দেখলে যেন বিপ্লবী হওয়া যায় না। চে এমন
একজন বিপ্লবী যিনি কোন নির্দিষ্ট জাতি বা গোষ্ঠীর নন বরং শোষিত বঞ্চিত
মানুষের কল্যানের চিন্তায় আজীবন লড়ে যাওয়া এক কিংবদন্তী যোদ্ধা। পৃথিবীর
যে কোন প্রান্তের শোষিতের জন্মভুমি ছিল তাঁর জন্মভুমি। ল্যাটিন আমেরিকার
দেশে দেশে পুজিঁবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী শোষনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়েছেন
অসীম ত্যাগ-তীতিক্ষার মাঝে এবং শেষ পর্যন্ত বলিভিয়ায় নিহত হয়ে বিশ্বের
লক্ষ লক্ষ মুক্তিকামী মানুষের হৃদয়ে বিপ্লবের প্রতীক হিসেবে স্থান করে
নিয়েছেন।
১৯৪৮ সালে চে’র বয়স মাত্র ২০ বছর। তরতাজা তরুন চে গেভারা বুয়েনস আইরেস
বিশ্ববিদ্যালয়ে মেডিকেল বিভাগের ছাত্র। পহেলা জানুয়ারী ১৯৫০ সালে চে তাঁর
জীবনের প্রথম ভ্রমনের প্রস্তুতি নেন। তিনি আরাজেন্টিনার উত্তর প্রদেশের
বিভিন্ন স্থানে ভ্রমন করেন একটি বাই সাইকেলের সাহায্যে। ১৯৫২ সালের
জানুয়ারী মাসে তিনি সিদ্ধান্ত নেন সমগ্র ল্যাটিন আমেরিকা ভ্রমনের। চে এর
মোটর সাইকেল ডাইরি মুভিটা যারা( বইও আছে) দেখেছনে তারা জেনে থাকবেন-
ল্যাটিন আমেরিকা ভ্রমনে চে এর সাথে ছিলেন তার বন্ধু আলবার্তো গ্রানাডো।
মটর সাইকেলের মডেল ছিল নরটন-৫০০ সিসি।ছবির শেষের দিকে কুষ্ঠাশ্রমের কয়েকটি
দৃশ্য আমাকে নাড়া দেয়। তখন কুষ্ঠরোগীদের সাথে সাধারণ মানুষ খুব একটা ভালো
ব্যবহার করতো না। অস্পৃশ্য মনে করা হতো তাদের। নদীর ওপর পাশে কুষ্ঠরোগীদরে
আশ্রম। সে দিন ছিলো চে এর জন্মদিন। ডাক্তারদের ডরমেটরিটে পার্টি হচ্ছে।
গভীর রাত। হঠাৎ চে ভাবলেন তিনি জন্মদিন পালন করবেন নদীর অপর পাশে গিয়ে-
কুষ্ঠরোগীদরে সাথে। সবাই হা হা করে উঠলো। বলে কি!! চে দৃরপ্রতিজ্ঞ।
ডাক্তার বললেন এতো রাতে বোট নেই। গোয়ার চে কারো বাধা না মেনে দৌড়ে গিয়ে
ঝাপ দিলেন নদীতে। সবাই চে এর পিছু পিছু ছুটে এসে নদীর পাড়ে এসে দাড়িয়েছে।
ছোটবেলা থেকে চে-এর হাপাঁনী। ইনহেলার নিতে হয়। সবাই শঙ্কিত, এত বড় নদী পাড়
হবেন কি করে চে। একি পাগলামি!! মাঝ নদীতে যেতে যেতে যদি দম শেষ হয়ে যায়।
কিন্তু জেদী, গোয়ার চে ঠিকই পৌছে গেলেন ওপারে কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত অসংখ্য
হাত টেনে তুললো তাকে, বুকে জড়িয়ে নিল। এপার ওপার দুই পাড়ের সবাই হর্ষধ্বনী
দিয়ে অভিনন্দন জানালো তাকে।
সকল বাধাকে উপেক্ষা করে শোষিত- বঞ্চিত মানুষের কাছে পৌছানোর, তাদের পাশে
থাকার এই অদম্য ইচ্ছা আমাদের ক’জনরে আছে। আমি দৃশ্যটি দেখে এতই আবগে
আপ্লুত হই যে আমার বুকে কেমন জানি শূন্য শূন্য লাগতে থাকে। অনেক কষ্টে
চোখের পানি আটকিয়ে রাখি। আমি চিন্তা করতে ভুলে যাই। ভোগবাদী সমাজ চে কে
এখন ফ্যাশনে পরিনত করেছে। চে কে গাত্রে ধারণ করে অনেকেই দার্শনিক আনন্দে
আনন্দিত হচ্ছেন, গর্বিত হচ্ছেন। কিন্তু চে কেবল টি-শার্টের মডেল নন। চে
মানে নিপিড়িত, মানবাধিকার বঞ্চিত হাজারো মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দেয়ার
লড়াই- মানুষ ও মাটি কে নিয়ে এক সুন্দর সমাজ গঠনের স্বপ্ন , চে মানে
বিপ্লব, চে মানে বিদ্রোহ রক্তচোষা সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে । চে মানে
অনেক অনেক বড় কিছু, শ্রমজীবি মানুষের মুখে পরিতৃপ্তির হাসি।
৯ অক্টোবর সাম্রাজ্যবাধীদের হাতে নিহত হবার আগেই তিনি পৌছে গিয়েছিলেন
লক্ষ-কোটি মানূষের অন্তরে।শেষে ল্যাটিন আমেরিকান লেখক, গ্যাবরিয়েল
মার্সিয়া মারকুয়েজ উদ্ধৃতি তুলে দিচ্ছি, আমি হাজার বছর ধরে এক নাগাড়ে লিখে
যেতে পারি , কোটিরও বেশি পৃষ্ঠা, শুধুমাত্র চে কে নিয়ে।